Skip to main content

ইসলামে পর্দার বিধান নারী ও পুরুষ


বিচারপতি মো. আব্দুস সালাম : হযরত মোহাম্মদ রাসুলুল্লাহ্ হযরত যায়নাব রাযি আল্লাহু আনহাকে বিবাহ করেন এবং তারপর প্রথম পর্দার বিধান জারী করা হয় হিজরী ৫ম সনে, তখন হযরত আনাস (রাঃ) ইবনে হযরত উম্মু সুলাইম (রাঃ) ১৫ বৎসরের যুবক, তাঁহার সামনে প্রথম পর্দার আয়াত নাযিল হয় :
ঊসুরা আহযাব, আয়াত-৫৪। অর্থঃ হে ঈমানদারগণ! তোমরা নবীগৃহে বিনা অনুমতিতে প্রবেশ করোনা। পর্দার বিধান সমূহকে ২টি পর্যায়ে ভাগ করা হয়েছেঃ
প্রথম পর্যায় : ঘরোয়া পরিবেশে পর্দা আল্লাহ্ পাক এরশাদ করেন : আর তোমরা (মহিলাগণ) তোমাদের ঘরের মধ্যে অবস্থান করো। পূর্বের জাহিলিয়াতের মতো নিজেদের রূপ সৌন্দর্য ও দেহ প্রদর্শন করে বেড়িওনা। (সূরা আহযাব, আয়াত-৩৩) এর ব্যাখ্যায় আল্লামা ইবনে কাসীর (রহঃ) লিখেছেনঃ অর্থঃ তোমাদের ঘরকে তোমরা আঁকড়ে থাকো এবং বিনা প্রয়োজনে ঘর থেকে বের হবেনা।
নারী সম্পর্কে কোরআনুল কারিমে বলা হয়। অর্থঃ তোমরা তাদের কাছে পৌঁছে শান্তি লাভ কর, এ কারণেই তাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে। পুরুষের যত প্রয়োজন নারীর সাথে সম্পৃক্ত সবগুলো সম্পর্কে চিন্তা করলে দেখা যায় যে, সবগুলোর সারমর্ম হচ্ছে মানসিক শান্তি ও সুখ এবং বৈবাহিক জীবনের যাবতীয় কাজকর্মের সারমর্ম হচ্ছে মনেরে শান্তি ও সুখ। পর্দা ও ছতর ঢাকা মহিলাদের জন্য অপরিহার্য কর্তব্য (ফরজ)। মুসলমান হিসেবে আমরা এই কর্তব্যকে এড়িয়ে চলতে পারিনা। পাক কোরআনে স্পষ্ট নির্দেশঃ হে ঈমানদারগণ তোমরা পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ করা। সূরা আল বাকারাহ্ আয়াত-২০৮। পর্দা যদি না মানা হয় এতে পরিপূর্ণভাবে ইসলাম পালন করা হলোনা। ইসলাম ধর্মে নারীদের যে মর্যাদা দেওয়া হয়েছে তা অন্য কোন ধর্মে দেওয়া হয়নি। মুসলিম নারীগণ কুরআন শরীফ পড়তে পারে। হিন্দু ও অন্য বহু ধর্মে মহিলাগণ ধর্মগ্রন্থ স্পর্শ করতে পারেনা। কুরআনুল করিমে নারীদের সানে আলাদা ভাবে একটি সূরা- সুরা নিসা” নাযিল করা হয়েছে। নারীদের ইজ্জত ও সম্মানকে হেফাজতের জন্য পর্দা একটি উত্তম পন্থা। আরবীতে “আওরৎ” শব্দের অর্থ পর্দা যাহা মহিলা ও পুরুষ উভয়ের জন্য প্রযোজ্য। ছতর পর্দা দুইটি আলাদা শব্দ। দুই হাতের কব্জি, দুই পা, ও মুখ মন্ডল ছতরের মধ্যে না পড়লেও মেয়েদের সমস্ত শরীর পর্দার অন্তর্ভুক্ত। বর্তমান যুগে হজ্জের এহরাম অবস্থায়ও মেয়েদের চেহারা ঢাকতে হবে, যেন পর পুরুষের নজরে না পড়ে।
এর ব্যাখ্যায় আল্লামা ইবনুল আরাবী (রহঃ) লিখেছেন : অর্থ - তোমরা ঘরে বসবাস করো, বাইরে দৌড়াদৌড়ি করোনা এবং ঘর ছেড়ে বাইরে যেওনা। আহকামুল কোরআন, তয় খ-, পৃঃ ১৫৩৩
আল্লামা আলুসী (রহঃ) এর ব্যাখ্যা বলেছেন- তোমরা তোমাদের ঘরের মধ্যে নিজেদেরকে খাপ খাইয়ে নাও (adjust yourself at home) তাফসীরে রুহল মা’আনী, ২২-খণ্ড, পৃঃ ৬ রাসূলুল্লাহ্  এরশাদ করেছেনঃ
 তাদের ঘরই তাদের জন্য (সর্বাপেক্ষা) কল্যাণকর। মেয়েদের প্রকৃত কর্মক্ষেত্র হচ্ছে তার বাড়ী বা ঘর এবং পুরুষদের কর্মক্ষেত্র হচ্ছে ঘরের বাইরে। দ্বিতীয় পর্যায়ঃ বাইরের পরিবেশে পর্দা নবী করীম এরশাদ করেছেনঃ
 তোমাদেরকে (মহিলাগণকে) তোমাদের প্রয়োজনের দরুন ঘরের বাইরে যেতে অনুমতি দেওয়া হয়েছে। (আল-বুখারী) অপর এক হাদীসে বলা হয়ঃ
অর্থঃ মেয়েরা ঘর থেকে বাইরে বের হবার কোন অধিকারই রাখেনা, তবে যদি কেউ খুব বেশী নিরুপায় হয়ে যায় এবং তাঁর খাদেমও (চাকর) না থাকে, এমতাবস্থায় সে প্রয়োজনীয় কাজের জন্য বাইরে বেরুতে পারবে। (তাবরানী)। প্রয়োজনে মেয়েরা বাইরে যেতে পারবে তবুও তা শর্তহীন নয়। দুটো শর্তে তাদেরকে বাইরে যেতে অনুমতি দেওয়া হয়েছে। প্রথম শর্ত হচ্ছে-
পূর্বের জাহিলিয়াতের মতো নিজেদের রূপ সৌন্দর্য ও দেহ সৌষ্ঠব প্রদর্শন করে বেড়িওনা। (সুরা আল আহযাব, আয়াত-৩৩)
দ্বিতীয় শর্ত হচ্ছে
হে নবী! তোমার স্ত্রী, কন্যা ও মুসলিম মহিলাদেরকে বল, তারা যেন সকলে ঘর থেকে বাহিরে যাবার সময় মাথার উপর তাদের চাদর ঝুলিয়ে দেয়। এভাবে বের হলে তাদেরকে চেনা খুব সহজ হবে, ফলে কেউ তাদেরকে উত্ত্যক্ত করবেনা। (সূরা- আল্ আহযাব, আয়াত-৫৯)
হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদের ঘর ছাড়া আর কারো ঘরে প্রবেশ করোনা যতক্ষণ তোমরা তোমাদের সম্পর্কে পরিচিতি করিয়ে না নেবে এবং ঘরের লোকদের প্রতি সালাম না পাঠাবে। এ নীতি অনুসরণ করা তোমাদের জন্য অত্যন্ত কল্যাণকর। সম্ভবতঃ তোমরা এ উপদেশ গ্রহণ করে তদানুযায়ী। কাজ করবে। (সুরা-আন নূর, আয়াত-২৭) যদি সেখানে কোন পুরুষ ব্যক্তি না থাকে এবিং জরুরী ভিত্তিতে সে বাড়ী থেকে কিছু সংগ্রহ করার প্রয়োজন হয়, তবে তার বিধানও দয়াময় আল্লাহ্ দিয়েছেন।
এরশাদ হচ্ছে : যখন তোমরা তাদের নিকট কিছু চাবে, পর্দার আড়াল থেকেই চাবে। (সত্যি কথা বলতে কি) তোমাদের ও তাদের দিলের পবিত্রতা রক্ষার জন্য এটাই উত্তম পন্থা। (সূরা আল আহযাব, আয়াত- ৫৩)।  হে নবী! মুমিন পুরুষদের বলে দিন, তারা যেন নিজেদের দৃষ্টিকে নিয়ন্ত্রণ করে রাখে এবং লজ্জাস্থানের পবিত্রতা রক্ষা করে। - এবং মুমিন মহিলাদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে নিচু করে রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। সুরা আন নূর, আয়াত- ৩০-৩১ রাসূলে করিম।
 মেয়েদের ব্যাপারে বলেছেন। বোরকা গায়ে মদীনার মসজিদের নববীতে নামায পড়ার চেয়ে ঘরে পড়া উত্তম। বোরকাওয়ালীকে আমরা পুরুষেরা দেখতে পাচ্ছিনা, কিন্তু বোরকাওয়ালী আমাদেরকে দেখতে পাচ্ছেনা। মেয়েদের অন্ধ লোকের সামনে যাওয়াও নিষেধ, যেহেতু ঐ মেয়ে লোকটি অন্ধের চেহারা দেখতে পাচ্ছে। আব্দুল্লাহ্ ইবনে উম্মে মাখতুম অন্ধ সাহাবীর সামনে হযরত উম্মে সালমাও এবং মায়মুনা (রাঃ) কে যেতে নিষেধ করা হয়। (বুখারী শরীফ) ওযূ গোসলের মাধ্যমে পবিত্র হওয়া : বাহ্যিক নাপাক বস্তু থেকে দেহকে পবিত্র করা ছাড়াও সালাতের জন্য দ্বিতীয় প্রকার পবিত্রতা হলো ওযু, গোসল বা তায়াম্মুমের মাধ্যমে নিজেকে পবিত্র করা। ছতর আবৃত করা : “ছতর” বলতে বুঝানো হয় “শরীরের গোপনাংশ (Private parts), বা শরীরের যে অংশ আবৃত করা মুসলিম নারী পুরুষের জন্য ফরয বা অত্যাবশ্যকীয়।
ইসলামের নির্দেশনা অনুসারে মুসলিম নর-নারীর জন্য শরীরের বিশেষ কিছু অংশ সদা সর্বদা অন্য মানুষের দৃষ্টি থেকে আবৃত করে রাখা অত্যাবশ্যক। এই অংশগুলি সালাতের মধ্যে আবৃত করে রাখা ফরয। এছাড়া আরো কিছু অংশ আবৃত করা উত্তম। পুরুষ ও নারীদের জন্য এ বিষয়ে পৃথক বিধান রয়েছে। পুরুষদের জন্য সদা সর্বদা নাভী থেকে হাঁটু পর্যন্ত শরীর অন্য মানুষের দৃষ্টি থেকে আবৃত করে রাখা ফরয। এই অংশটুকু স্ত্রী ছাড়া অন্য কাউকে দেখানো হারাম। সালাতের মধ্যে এই অংশটুকু আবৃত করে রাখা ফরয। কেউ দেখুক বা না দেখুক শরীরের এই অংশের মধ্যে কোন স্থান অনাবৃত হলে নামায নষ্ট হয়ে যাবে। তবে কাপড় না থাকলে উলঙ্গ হয়েই সালাত আদায় করতে হবে। এছাড়া কাঁধ ও শরীরের উপরিভাগ আবৃত করা সুন্নত। মুমিনের উচিত মহান আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর জন্য মর্যাদাময়, মহিমাময় আল্লাহ ও তার রাসুলুল্লাহ এর পছন্দনীয়, পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি পোশাক পরিধান করা। মহিলাদের পোশাকের মূলত ৪টি স্তর রয়েছে। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কোন পোশাকের বাধ্যবাধকতা নেই। অন্য মুসলিম মহিলাদের দৃষ্টি থেকে নাভী থেকে হাঁটু পর্যন্ত স্থান আবৃত করে রাখা মুসলিম মহিলার জন্য ফরয। পিতা, আপন চাচা, ভাতিজা, ভাগিনেয়, শ্বশুর প্রমুখ মাহরাম (বিবাহ সম্ভব নয়) আত্মীয়দের সামনে মোটামুটি কাঁধ থেকে হাঁটু পর্যন্ত শরীর আবৃত করতে হবে। বাকী সকল পুরুষের দৃষ্টি থেকে মুসলিম মহিলা মাথার চুলসহ মাথা ও পুরো শরীর আবৃত করে রাখবেন। এগুলি তাদের সামনে অনাবৃত করা হারাম ও কঠিন গোনাহের কারণ। সালাতের মধ্যেও এই অংশটুকু আবৃত করতে হবে। শুধুমাত্র মুখমন্ডলও কব্জি পর্যন্ত দুই হাত বাদে পুরো শরীর আবৃত করতে হবে। সালাতের মধ্যে যদি কোন মহিলার কান, চুল, মাথা, গলা, কাঁধ, পেট, পায়ের নলা ইত্যাদি অনাবৃত হয়ে যায় তাহলে সালাত নষ্ট হয়ে যাবে। সাধারণভাবে শাড়ী মুসলিম মহিলার জন্য অসুবিধাজনক পোশাক। ঢিলেঢালা পুরো হাতা সেলোয়ার-কামিজ বা ম্যাক্সি মুসলিম মহিলার জন্য উত্তম আদর্শ পোশাক। সর্বাবস্থায় সাধারণ পোশাকের উপর অতিরিক্ত বড় চাদর দিয়ে ভালভাবে নিজেকে আবৃত করে সালাত আদায় করতে হবে। মাথার চুল, কান, গলা ইত্যাদি ভালভাবে আবৃত রাখার দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।
নবী করীম এরশাদ করেন, কোন মহিলার জন্যই তাহার মাথার চুল খোলা রাখা জায়েয নেই। যদি সে তার চুল খোলা রাখে তাহলে তার মাথায় যত পরিমাণ চুল রয়েছে তার এক একটির পরিবর্তে এক একটি পাপ লেখা হয়। আর কিয়ামত দিবসে তাহার শরীরে দাগ লাগিয়ে দেয়া হবে। আর এই মহিলার প্রতি আল্লাহ তায়ালা, ফেরেশতাদের পয়গম্বরদের অভিশাপ। (হাদিসে লোবাবুল আখাবার, পৃষ্ঠা- ৯৮-৯৯)
(ভারতের দারুল উলূমূল দেওবন্দের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরীতে সিহা সিত্তা ভিত্তিক আরবী, ফারসী ও উর্দুতে লিখিত এই হাদিসের কিতাব সংরক্ষিত)
মুফতী সাহেবগণ ও এ বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করেন নাই এবং সম্ভবতঃ এই কারণেই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ও বাধ্যকর পরিস্থিতিতে জামাতে ইসলাম বাংলাদেশ এবং ইসলামী ঐক্যজোট মহিলা নেতৃত্ব স্বীকার করিয়া একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দলের সহিত জোট গঠন করিয়া রাষ্ট্র এবং দেশ পরিচালনায় অংশ গ্রহণ করিয়াছেন।
আমরা আশা করি শরীয়াতের সীমারেখা ও ধর্মীয় দৃষ্টি কোনের দিক বিশেষ দৃষ্টি রাখিয়া ইসলামী দল সমূহ দেশ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় ও জনস্বার্থে যথাযথ ভূমিকা পালন করিবেন।
 হযরত আবু হুরাইয়া (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলল্লাহ বলেছেন ও দোযখীদের এমন দুটি দল রয়েছে যাদের আমি দেখিনি। তাদের একদলের হাতে গরুর লেজের মত চাবুক থাকবে। তারা তা দিয়ে লোকদের মারবে। আর একদল হবে নারীদের। তাদেরকে পোশাক পরিচ্ছেদ পরিধান করা সত্ত্বেও উলংগ দেখাবে। গর্বের সাথে নৃত্যের ভঙ্গিতে বাহু দুলিয়ে পথে চলবে। তারা পর পুরুষকে আকৃষ্ট করবে এবং নিজেরাও আকৃষ্ট হবে। বখুতী উটের কুঁজের মত করে খোপা বাঁধবে, অর্থাৎ, তাদের মাথার খোপাগুলো হবে বড় বড় উটের হেলে পড়া কুঁজের ন্যায়। এ সব নারী কখনও জান্নাতে প্রবেশ করবেনা। জান্নাতের সুগন্ধিও পাবেনা। অথচ জান্নাতের সুগন্ধি অনেক দূর থেকে পাওয়া যাবে। (মুসলিম শরীফ, রিয়াদুস সালেহীন, পৃঃ১১০) ওড়না দিয়ে বা রুমাল দিয়ে মাথা ঢাকা স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের জন্য গার্মেন্টস এর মহিলা কর্মী এবং মহিলাদের জন্য এত বেশী জরুরী অথচ কর্মজীবী বা বেকার মহিলা, ছাত্রী সমাজ ও মা বোনদের অনেকে এই হাদিসের মর্ম অবগত নহেন। ইহা জানা বিশেষ জরুরী। অর্থঃ- হযরত জাবির (রা) থেকে বর্ণিতঃ তোমরা বাম হাত দিয়ে পানাহার করনা। কেননা, শয়তান বাম হাত দিয়ে পানাহার করে। (মুসলিম শরীফ)।
পুরুষ ও মহিলা উভয়ের জন্য পর্দা করা ফরয :
 (হে রাসুল সাঃ) মুমিনদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং তাদের যৌনাঙ্গের হেফাযত করে। —(৩১) ঈমানদার নারীদেরকে বলুন তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত নত রাখে এবং তাদের যৌন অঙ্গের হেফাযত করে। - সুরা আন-নুর। (আয়াত ৩০-৩১) হাদিস : যে, গুপ্ত অঙ্গ দেখায় এবং দেখে উভয়ে অভিশপ্ত। কাম প্রবৃত্তির প্রথম ও প্রারম্ভিক কারণ হচ্ছে দৃষ্টিপাত করা ও দেখা এবং সর্বশেষ পরিণতি হচ্ছে ব্যভিচার। তাবারানী হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) থেকে বর্ণনা করেন দৃষ্টিপাত শয়তানের একটি বিষাক্ত শর। হযরত জারীর ইবনে আবদুল্লাহ বাজালী থেকে মুসলিম শরীফে বর্ণিত হাদিস মতে-ইচ্ছা ছাড়াই হঠাৎ কোন বেগানা নারীর উপর দৃষ্টি পতিত হলেই সেদিক থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নাও। হযরত আলী (রা) বর্ণিত হাদিস মতে- প্রথম দৃষ্টি মাফ এবং দ্বিতীয় দৃষ্টিপাত গোনাহ্। অকস্মাৎ ও অনিচ্ছাকৃত দৃষ্টিপাত ক্ষমারযােগ্য। নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত পুরুষের গোপন অঙ্গ এবং দেহ মুখ মন্ডল ও হাতের তালু ব্যতীত নারীর গোপন অঙ্গ। সবার কাছেই এ সব জায়গা গোপন রাখা ফরয। সুরা আন-নুর, তাফসীরে মাআরেফুল কোরআন, পৃঃ ৯৩৯।
আল্লাহ রাব্বুল ইযযত আমাদের সকলকে আমল করার তাওফীক দান করুন। আমিন। নারীর মুখম-ল, হাতের তালু, এবং পদযুগল গুপ্ত অংগের বাহিরে রাখা হয়েছে, নামাযে এ সব অংগ খোলা থাকলে নামাযে কোন ত্রুটি হবে না। এর অর্থ এরূপ কখনও নয় যে মাহররাম নয়, এরূপ ব্যক্তির সামনেও সে শরীয়ত সম্মত ওযর ব্যতীত মুখম-ল খুলে ঘুরা ফেরা করবে। নামায শুধু গুপ্ত অংগ গোকন করাই কাম্য নয়, বরং সাজ সজ্জার পোশাক পরিধান করতেও বলা হয়েছে। তাই পুরুষের উলংগ মাথায় নামায পড়া কিংবা কনুই খুলে নামায পড়া মাকরূহ। হাফসার্ট পরিহিত অবস্থায় হোক কিংবা আস্তিন গুটানো হোক-সর্ববস্থায় নামায মাকরূহ হবে। (পৃ:৪৩৭ তাফসীর মারেফুল কোরআন) হযরত আশরাফ আলী থানভী সাহেবের সর্বশেষ খলিফা হযরত মাওলানা আবরাবুল হক সাহেব লিখিত কিতাব, (এক মিনিটের মাদ্রাসায়) বর্ণিত আছে মাকরূহ নামায-১ম পর্যায়ের নামায নহে, দ্বিতীয় পর্যায়ের নামায নহে, মাকরূহ তৃতীয় পর্যায়ের নামায গ্রে ডে সাসন পদ্ধতি চালুর পূর্বে পরীক্ষায় ৬০% ১ম বিভাগ,। ৪৫% ২য় বিভাগ ও ৩৩% তৃতীয় বিভাগ ছিল, মাকরূহ নামায ১০০% নম্বরে ৩৩ নম্বর পাওয়ার সমতূল্য যাহা অব্যশই বর্জনীয়। অস্ট্রেলিয়ায় জানার কারণে শতকরা ৯০% মুসল্লি টুপি ছাড়া ও হাফসাট বা হাফ গেঞ্জি গায়ে জুম্মার নামায আদায় করে। ইঞ্জিনিয়ার ইসহাক সাহেব P.w.D Additional Chief Engineer তিন মাস অষ্ট্রেলিয়ায় থেকে এ অবস্থা দেখে এসে আমার কাছে বর্ণনা করেন, সেই তুলনায় আমাদের দেশের অবস্থা অনেক ভাল।
আল্লাহর হুকুম বস্তাবায়ন
হানিফ খান উচ্চ বিদ্যালয় এলাকার বিখ্যাত হাই স্কুল। ছেলে ও মেয়ে ছাত্রছাত্রীরা এক সাথে লেখাপড়া করে। ইংরেজিতে বলে-Co education: মাওলানা রফিক উদ্দীন তালুকদার হাইস্কুল এর একজন প্রখ্যাত ধর্মীয় শিক্ষক। সহশিক্ষার বিরোধিতা করেন নাই। সাউদী আরবে বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে ছেলেমেয়েরা এক সাথে লেখাপড়া করে। কিন্তু ধর্মীয় অনুশাসন অনুযায়ী যথাযথ পর্দার ব্যবস্থা আছে। ছাত্র ও ছাত্রীগণ আলাদা লাইনে বসেন। ছাত্র ছাত্রীদের মধ্যে মাঝখানে তীর্যকভাবে বিজ্ঞানসম্মত পর্দার ব্যবস্থা আছে। ছাত্র ও ছাত্রীগণ শিক্ষককে দেখতে পান লেকচার শোনেন কিন্তু ছাত্রগণ ছাত্রীদের দেখতে পায় না এবং ছাত্রীগণও ছাত্রদের দেখতে পায় না। ধর্মীয় শিক্ষক মাওলানা রফিক উদ্দীন তালুকদার তার হাইস্কুলে সাউদি আরবের ব্যবস্থার কাছাকাছি ও প্রায় অনুরূপ ছাত্র ও ছাত্রীদের মধ্যে বেশ কিছুদিন যাবৎ পর্দার ব্যবস্থা করেন ও সুন্দর পরিবেশে লেখাপড়া চলিতে ছিল। মাঝে মাঝে স্কুলের পরিচালনা পরিষদ (Management Committee) এর সদস্য পরিবর্তন হয়, ২০১১ সালের এপ্রিল মাসে শাসকদল সহ কোন কোন রাজনৈতিক দলের কিছু সদস্য ম্যানেজিং কমিটিতে আসেন, বিভিন্ন ক্লাসের লেখাপড়ার খোঁজ খবর নেন, ছাত্র ছাত্রীদের মধ্যে প্রচলিত পর্দার কথা তাদের নজরে আসে ও কমিটির মধ্যে আলোচনা শুরু হয়। কমিটির মধ্যে নতুন আসা কিছু কিছু সদস্য ও অভিভাবক প্রচলিত পর্দার ব্যবস্থাকে সামাজিক অগ্রগতির পরিপন্থী বলে মনে করেন ও পর্দার প্রচলিত ব্যবস্থা বন্ধ করতে ও তুলে ফেলতে চান বলে কমিটিকে জানান ও মাওলানা রফিক উদ্দীন তালুকদারকে পর্দা ব্যবস্থা তুলে নেওয়ার জন্য চাপ দিতে শুরু করেন।
২০১১ সালের এপ্রিল মাসে সিলেট-হবিগঞ্জ নিবাসী হাফেজ ক্বারী মোঃ তাজাম্মুল হোসাইন ও ধর্মীয় শিক্ষক মাওলানা রফিক উদ্দীন তালুকদারের আপন ভাগিনা তখন মিরপুর ১২-বি, পল্লবী ঢাকা ১২১৬ বায়তুল নূর জামে মসজিদে মোয়াজ্জিন হিসেবে কর্মরত। কর্তমানে জামিয়া কাশিমিয়া আশরাফুল উলুম ঢাকা মাদরাসার হাফিজিয়া বিভাগের শিক্ষক। মোয়াজ্জিন হাফেজ কারী মোঃ তাজাম্মুল হোসেন ২০১১ সালের এপ্রিল মাসের প্রথম দিকে তার আপন মামা মাওলানা । রফিক উদ্দীন তালুদারের হবিগঞ্জ হানিফ খান উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের। মধ্যে বিদ্যমান পর্দাপ্রথা তুলে দেওয়ার প্রস্তাব ও মাওলানা সাহেবের জন্য বিব্রতকর সমস্যার কথা আমাকে (বিচারপতি মোঃ আব্দুস সালাম) জানানো হয়।
আমি বিচারপতি মোঃ আব্দুস সালাম মাওলানা রফিক উদ্দীন তালুকদার সাহেবকে ধৈর্যধারণের পরামর্শ প্রদান করি। “হাসবুনাল্লাহা ওয়া নেয়ামাল ওয়াফিল”- সূরা আলে ইমরান : আয়াত ১৭৩, শেষ অংশ আমলের জন্য বলি এবং পর্দা প্রথা বন্ধ না করে লম্বা ছুটিতে ও তাবলীগ জামাতে ৪০ দিনের চিল্লায় যেতে বলি। মাওলানা রফিক উদ্দীন সাহেব তাই করেন।
পরে জানতে পারি, মাওলানা রফিক উদ্দীন তালুকদারের অনুপস্থিতিতে (ছুটিকালীন) হাইস্কুল ম্যানেজিং কমিটির মিটিং হয়, গরম গরম আলোচনা হয়। স্কুল কমিটিতে এক অমুসলিম হিন্দু ভদ্রেেলাক সদস্য আছেন। আলোচনার এক পর্যায়ে হিন্দু ভদ্রেেলাক বলেন “আমার মেয়ে এই স্কুলের ছাত্রী, সে তো কোনদিন পর্দাপ্রথার বিরুদ্ধে আমাকে কোন কথা বলেনি, বরং বলেছে স্কুলের পরিবেশ ভালো। লেখাপড়া ভালো হয়, ছাত্রীরা লেখাপড়ায় বেশী মনোযোগী এবং আমার মেয়ে বর্তমান পরিস্থিতিতে স্কুলের পর্দা সিস্টেমকে সমর্থন করে। আমি নিজেও (হিন্দু সদস্য) বর্তমান ব্যবস্থাকে সমর্থন করি। পরে দেখা গেল কমিটির মিটিং এ অন্যান্য সকল মুসলিম সদস্য একে একে হিন্দু ভদ্রলোক সদস্যকে সমর্থন করে এবং মুসলিম সদস্য একে একে হিন্দু ভদ্রলোক ক্লাসে পর্দার ব্যবস্থা চালু ও
বজায় রাখার পক্ষে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় এবং ইনশাআল্লাহ আজও চালু আছে এবং আল কোরআনের সূরা মুহাম্মদ ২৬ পারা, ৩৮ নং আয়াত
আল্লাহ তায়ালা বাস্তাবায়ন করেন-যার অর্থ : “যদি তোমরা মুখ ফিরাইয়া নাও/বিমুখ হও, তিনি অন্য জাতিকে তোমাদের স্থলবর্তী করবেন; তাহারা তোমাদের মত হবে না। এ ক্ষেত্রে আল্লাহ তায়ালা হানিফখান উচ্চ বিদ্যালয় স্কুল কমিটির একজন হিন্দু ভদ্রলোক সদস্যের নেতৃত্বে ও সমর্থনে স্কুলে প্রচলিত পর্দা ব্যবস্থা চালু রেখে হযরত মাওলানা রফিক উদ্দীন তালুকদারের মান-সম্মান বজায় রেখেছেন এবং তাঁর ঈমানকে আরেও মজবুত করেছেন।
এই ঘটনার পর হাফেজ ক্বারী মোঃ তাজাম্মুল হোসাইন তার মামা হযরত মাওলানা রফিক উদ্দীন তালুকদারকে ঢাকা মিরপুর ১২-বি বায়াতুন নূর জামে মসজিদে আমাদের সামনে হাজির করেন তাঁর সাথে আমার কর্থবার্তা হয় এবং এক সাথে আল্লাহ তা’আলার নিকট দোয়া করি ও শুকরিয়া আদায় করি। আমিন।


Comments

Popular posts from this blog

সাইয়েদ আবুল আ'লা মওদুদী (রহঃ) ইসলামী ইসলামী আন্দোলনের উজ্জ্বল নক্ষত্র

সাইয়েদ আবুল আ'লা মওদুদী ছিলেন একজন মুসলিম গবেষক, সাংবাদিক, রাজনৈতিক নেতা ও বিংশ শতাব্দীর একজন গুরুত্বপূর্ণ ইসলামী চিন্তাবিদ, মুজাদ্দিদ ও দার্শনিক। তিনি দক্ষিণ এশিয়ার একজন গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বও ছিলেন। তিনি জামায়াতে ইসলামী নামে একটি ইসলামী রাজনৈতিক দলেরও প্রতিষ্ঠাতা। তিনি ছিলেন বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে প্রভাবশালী মুসলিম স্কলারদের মধ্যে একজন। তিনি ইতিহাসের দ্বিতীয় এবং সর্বশেষ ব্যক্তি যার গায়েবানা জানাজার নামাজ পবিত্র কাবাতে পড়া হয়। জন্ম :  মাওলানা সাইয়েদ আবুল আলা মওদূদী (রহ.) ২৫ সেপ্টেম্বর ১৯০৩ সালে ভারতের হায়দরাবাদ দাক্ষিণাত্যের শহর আওরঙ্গাবাদে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন তার বাবা মাওলানা আহমদ হাসান এর তিন সন্তানের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ। তাঁর পিতা ছিলেন চিশতি ধারার বংশধর। তাঁর পিতা ও মাতা উভয়ের পরিবার আফগানিস্তান থেকে ভারতে এসেছিলেন।  শিক্ষা ও ক্যারিয়ার :  শৈশবে নয় বছর পর্যন্ত মওদূদীকে গৃহশিক্ষা দেওয়া হয়, তিনি তার পিতার হাতে এবং তার দ্বারা নিযুক্ত বিভিন্ন শিক্ষকের কাছ থেকে ধর্মীয় শিক্ষা লাভ করেন। এই শিক্ষার মধ্যে ছিল আরবি, ফারসি, ইস...

ইরানের ওপর যে আক্রমণ করবে তাকেই প্রতিহত করা হবে

সৌদি আরবে মার্কিন সেনা পাঠানোর ঘোষণা আসার ২৪ ঘণ্টা পার হওয়ার আগেই পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ইরান। মধ্যপ্রাচ্যের দেশটি হুমকির সুরে বলেছে, ইরানের অভ্যন্তরে কোনো প্রকার হামলা তারা বরদাশত করবে না। আক্রমণকারী যেকোনো দেশকে ধ্বংস করে দেওয়ার হুমকিও দিয়েছে ইরান। ইরানের এক সিনিয়র সামরিক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে বিবিসির প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে। নাম প্রকাশ না করা সেই সামরিক কর্মকর্তা হুমকির সুরে বলেছেন, ‘ইরানের ব্যাপারে সতর্ক থাকো। কোনো ভুল কোরো না।’ সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের নাম না নিলেও প্রচ্ছন্নভাবে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে একপ্রকার হুমকিই দিয়েছেন ইরানের সেনা কর্মকর্তা ও ইরানিয়ান রেভল্যুশনারি গার্ডসের কমান্ডার-ইন-চিফ মেজর জেনারেল হোসেইন সালামি। ইরানের মাটিতে হামলা করার সাহস যেন কেউ না দেখায়, সে ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়েছেন তিনি। রাজধানী তেহরানে এক প্রদর্শনীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এসে ইরানের গণমাধ্যমকে তিনি বলেছেন, ‘যেকোনো ধরনের আগ্রাসন ঠেকাতে আমরা সম্পূর্ণভাবে প্রস্তুত। আমরা কখনোই বহির্বিশ্বের কোনো দেশকে ইরানে ঢুকে যুদ্ধাবস্থা সৃষ্টি করতে দেব না। ইরানের ওপর যে আক্রমণ করবে, তাকেই প্রতিহত করা হবে। আক্...

পবিত্র কোরআনের অনুবাদক গিরিশচন্দ্রের মৃত্যুবার্ষিকী আজ

আজ ১৫ আগস্ট, পবিত্র কোরআনের বাংলা অনুবাদক ভাই গিরিশচন্দ্র সেনের ১০৬তম মৃত্যুবার্ষিকী। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মহাগ্রন্থ আল-কোরআনের প্রথম সার্থক বাংলা অনুবাদক গিরিশচন্দ্র সেন ১৮৩৪ সালের এপ্রিল অথবা মে মাসে নরসিংদী সদর উপজেলার পাঁচদোনা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯১০ সালের ১৫ আগস্ট ঢাকায় তাঁর মৃত্যু হয়। গিরিশচন্দ্র সেন ছিলেন একাধারে সাহিত্যিক, গবেষক ও ভাষাবিদ। ব্রাহ্ম ধর্মপ্রচারক হিসেবে ‘ভাই’ খেতাবে ভূষিত হন তিনি। আবার আরবি ও ফার্সি ভাষায় জ্ঞান অর্জন ও কোরআন-হাদিসের প্রথম অনুবাদক হিসেবে লাভ করেন মৌলভি খেতাব। তিনি প্রায় সব ধর্মগ্রন্থ নিয়ে গবেষণা করেছেন। মৃত্যুর পর গিরিশচন্দ্রের স্মৃতিবিজড়িত পাঁচদোনার বাড়িটি সংরক্ষণ হয়নি। উল্টো দখলে চলে গিয়েছিল তাঁর ভিটেবাড়ি। নিশ্চিহ্ন হতে চলেছিল তাঁর শেষকৃত্যের স্থানটিও। দেশের দূর-দূরান্ত থেকে লোকজন গিরিশচন্দ্রের বাড়ি দেখার জন্য ছুটে এসে হতাশ হন। ২০০৮ সালে তৎকালীন ভারতীয় হাইকমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী কৌতূহলবশত বাড়িটি দেখতে গিয়ে দুঃখ প্রকাশ করেন। তিনি ভারত সরকারের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বাড়িটি সংস্কারে অনুদানের ব্যবস্থা করেন। পরে ভারতীয় সরকারের...