
আমরা যারা যুবক-যুবতী আছি, তারা কম বেশী ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় কিছু অনৈতিক খারাপ অভ্যাসের সাথে নিজেকে জড়িয়ে ফেলি মনের অজান্তে। যদিও শুরুর দিকে তা অনিয়মিত ভাবে হয়ে থাকে, কিন্তু অচেতন ভাবে এই খারাপ কাজ গুলো রীতিমত অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায়।তা থেকে প্রত্যাবর্তন করার পরেও নিজেকে অপরাধী মনে হয়। সাধারণত আমরা এই কাজ গুলো থেকে প্রতিদিন দূরে থাকব বা আর কোন দিন করব না বলে পণ করি। কিন্তু ইউনিভারসাল থুরথ, আমরা আমাদের কথার উপর ঠিকে থাকতে পারি না। আমি আমাদের নিত্যদিনের খারপ অভ্যাস গুলো উল্লেখ করে কাউকে নতুনভাবে মোটিভেট করতে পক্ষে নই। কারণ আমরা "নিজেরাই যতেষ্ট আমাদের নিজেদের হিসাব দেয়ার জন্য"। তবে একটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন, আমাদের সকল খারাপ কাজের মূল উপাদান হচ্ছে আমাদের নিজেদের চোখের দৃষ্টি। যা আমাদের সকল খারাপ কাজের ইন্ধনের যোগান নিশ্চিত করে। বিশেষ ভাবে আমরা যারা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ এবং যেখান আমাদের বিপরীত লিঙ্গ মানুষের সাথে চলাফেরা হয়, সেখানেই আমরা আমাদের চোখের দৃষ্টিকে আমাদের আওতায় আনতে পারি না। আমরা হাজার চেষ্টা করেও ৩-৪ জনকে স্কিপ করে চলি,কিন্তু ৫ জনের দিকে দৃষ্টিপাত করে থাকি। যা আমাদের প্রতিদিনের "পণ"কে ভঙ্গ করতে মধুর ভূমিকা পালন করে। আর এই দৃষ্টিই আমদের কে খারাপ চিন্তার জগতের দরজা খুলে দিতে মূখ্য কাজ করে। এ থেকে বাঁচার উপায় কি? যা আমরা মানবতার বন্ধু রাসূল (সাঃ) এর এক দার্শনিক বানীতে খুঁজে পাই, "হজরত জাবির (রাঃ) একবার রাসূল (সাঃ) কে প্রশ্ন করলেন? হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের চোখ মহিলাদের দিকে পতিত হলে কি করব?(*মনে করবেন না যে, এ সমস্যা শুধু আমার আপনার হয়। তা অতীতেও হয়ে ছিল কিন্তু তারা সমাধান আসার সাথে সাথেই গ্রহণ করেছিলেন। আর আমরা?) রাসূল (সাঃ) বললেন তুমি সাথে সাথে তোমার চোখ তার উপর থেকে নামিয়ে নাও"। আমাদের প্রিয় নবী (সাঃ) প্রায় সাড়ে ১৪শত বছর পূর্বে এর সমাধান দিয়ে গেছেন। আমাদের উচিত তাঁর কথা পুরোপুরি অনুসরণ করা। আর আমরা যদি এই কাজ অনিচ্ছায় করেও ফেলি তাহলে যেন আমরা নিজেদের কে খুব তাড়াতাড়ি শান্তির নীরে ফিরিয়ে আনি, মহান প্রভুর কাছে অনুতপ্ত হয়ে। আর এই ফিরে আসা যেন হয় আমাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ প্রত্যাবর্তন। আমরা নিচের এই হাদিসের মাধ্যমে বুঝতে পারব, সরিষা দানা পরিমাণ অনিচ্ছার দৃষ্টিও যদি কার উপর পড়ে তাহলে কি পরিমাণ অনুতপ্ত হওয়া প্রয়োজন।আর এই অনুতপ্তের পুরষ্কার আল্লাহ কিভাবে দিবেন। আসুন হাদিস টি পড়ি.......
রাসূল (সঃ) এর একজন প্রিয় সাহাবী, যার নাম ছা’লাবা (ثعلبه) । মাত্র ষোল বছর বয়স। রাসূল (সাঃ) এর জন্য বার্তাবাহক হিসেবে এখানে সেখানে ছুটোছুটি করে বেড়াতেন তিনি। একদিন উনি মদীনার পথ ধরে চলছেন, এমন সময় একটা বাড়ির পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় তাঁর চোখ পড়ল দরজা খুলে থাকা এক ঘরের মধ্যে। ভিতরে গোসলখানায একজন মহিলা গোসলরত ছিলেন, এবং বাতাসে সেখানের পর্দা উড়ছিল, তাই ছা’লাবার চোখ ঐ মহিলার উপর যেয়ে পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে উনি দৃষ্টি নামিয়ে নিলেন।
কিন্তু ছা’লাবার মন এক গভীর অপরাধবোধে ভরে গেল। প্রচন্ড দুঃখ তাকে আচ্ছাদন করল। তার নিজেকে মুনাফিক্বের মত লাগছিল। তিনি ভাবলেন, ‘কিভাবে আমি রাসূল (সাঃ) এর সাহাবী হয়ে এতোটা অপ্রীতিকর কাজ করতে পারি ? মানুষের গোপনীয়তাকে নষ্ট করতে পারি ? যেই আমি কিনা রাসূল (সাঃ) এর বার্তা বাহক হিসেবে কাজ করি, কেমন করে এই ভীষণ আপত্তিজনক আচরণ তার পক্ষে সম্ভব?’ তাঁর মন আল্লাহর ভয়ে কাতর হয়ে গেল। তিনি ভাবলেন, ‘না জানি আল্লাহ আমার এমন আচরণের কথা রাসূল (সাঃ) এর কাছে প্রকাশ করে দেয়!’ ভয়ে, রাসূল (সাঃ) এর মুখোমুখি হওয়ার লজ্জায়, তিনি তৎক্ষণাৎ ঐ স্থান থেকে পালিয়ে গেলেন।
এভাবে অনেকদিন চলে গেল। রাসূল সাল্লাল্লাহু ওয়ালাইহি ওয়াসাল্লাম অন্যান্য সাহাবাদের কে ছা’লাবার কথা জিজ্ঞেস করতেই থাকতেন। কিন্তু সবাই জানাল কেউ-ই ছা’লাবাকে দেখেনি। এদিকে রাসূল (সাঃ) এর দুশ্চিন্তা ক্রমেই বাড়ছিল। তিনি উমর (রাঃ), সালমান আল ফারিসি সহ আরো কিছু সাহাবাদের পাঠালেন ছা’লাবার খোঁজ আনার জন্য। মদীনা তন্ন তন্ন করে খুঁজেও ছা’লাবার দেখা মিলল না। পরে মদীনার একেবারে সীমানাবর্তী একটা স্থানে, মক্কা ও মদীনার মধ্যখানে অবস্থিত পর্বতময় একটা জায়গায় পৌঁছে কিছু বেদুঈনের সাথে দেখা হল তাদের। দেখানে এসে তারা ছা’লাবার সম্পর্কে খোঁজ খবর নিতে শুরু করলেন। ‘তোমরা কি লম্বা, তরুণ, কম বয়সী একটা ছেলেকে এদিকে আসতে দেখেছ?
বেদুঈনগুলো মেষ চড়াচ্ছিল। তারা জবাব দিল, সে খবর তারা জানেনা, তবে তারা জিজ্ঞেস করল, ‘তোমরা কি ক্রন্দনরত বালকের সন্ধানে এসেছ?’ একথা শুনে সাহাবারা আগ্রহী হয়ে উঠলেন এবং তার বর্ণনা জানতে চাইলেন। উত্তরে ওরা বলল, ‘আমরা প্রতিদিন দেখি মাগরিবের সময় এখানে একটা ছেলে আসে, সে দেখতে এতো লম্বা, কিন্তু খুব দুর্বল, সে শুধুই কাঁদতে থাকে। আমরা তাকে খাওয়ার জন্য এক বাটি দুধ দেই, সে দুধের বাটিতে চুমুকদেয়ার সময় তার চোখের পানি টপটপ করে পড়ে মিশে যায় দুধের সাথে, কিন্তু সেদিকে তার হুঁশ থাকেনা!’ তারা জানালো চল্লিশ দিন যাবৎ ছেলেটা এখানে আছে। একটা পর্বতের গুহার মধ্যে সে থাকে, দিনে একবারই সে নেমে আসে, কাঁদতে কাঁদতে; আবার কাঁদতে কাঁদতে, আল্লাহর কাছে সর্বদা ক্ষমা প্রার্থনা করতে করতে উপরে চলে যায়।
সাহাবারা বর্ণনা শুনেই বুঝলেন, এ ছা’লাবা না হয়ে আর যায় না। তবে তাঁরা উপরে যেয়ে ছা’লাবা ভড়কে দিতে চাচ্ছিলেন না, এজন্য নিচেই অপেক্ষা করতে লাগলেন।
যথাসময়ে প্রতিদিনের মত আজও ছা’লাবা ক্রন্দনরত অবস্থায় নেমে আসলেন, তাঁর আর কোনদিকে খেয়াল নাই। কী দুর্বল শরীর হয়ে গেছে তাঁর! বেদুঈনদের কথামত তাঁরা দেখতে পেলেন, ছা’লাবা দুধের বাটিতে হাতে কাঁদছে, আর তাঁর অশ্রু মিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে। তাঁর চেহারায় গভীর বিষাদের চিহ্ন স্পষ্টভাবে প্রকাশ পাচ্ছে।
সাহাবারা তাকে বললেন, ‘আমাদের সাথে ফিরে চল’; অথচ ছা’লাবা যেতে রাজি হচ্ছিলেন না। তিনি বারবার সাহাবাদেরকে জিজ্ঞেস করতে লাগলেন, ‘আল্লাহ কি আমার মুনাফেক্বী বিষয়ক কোন সূরা নাযিল করেছে?’ সাহাবারা উত্তরে বললেন, ‘না আমাদের জানামতে এমন কোন আয়াত নাযিল হয় নাই।’ উমর (রাঃ) বললেন, রাসূল (সাঃ) আমাদেরকে তোমাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য পাঠিয়েছেন। তুমি যদি এখন যেতে রাজি না হও, তাহলে তোমাকে আমরা জোর করে ধরে নিয়ে যাব।
মহানবী (সাঃ) এর কাছে এসে ছা’লাবা আবারও একই প্রশ্ন করে, ‘আল্লাহ কি আমাকে মুনাফিক্বদের মধ্যে অন্তর্গত করেছেন অথবা এমন কোন আয়াত নাযিল করেছেন যেখানে বলা হয়েছে আমি মুনাফিক্ব?’ রাসূল (সাঃ) তাকে নিশ্চিত করলেন যে এমন কিছুই নাযিল হয়নি। তিনি ছা’লাবার দুর্বল পরিশ্রান্ত মাথাটা নিজের কোলের উপর রাখলেন। ছা’লাবা কাঁদতে কাঁদতে বলে উঠলেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল, এমন গুনাহগার ব্যক্তির মাথা আপনার কোল থেকে সরিয়ে দিন।’ উনার কাছে মনে হচ্ছিল যেন সে এসব স্নেহের যোগ্য নাহ।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে সান্ত্বনা দিতেই থাকলেন। আল্লাহর রহমত আর দয়ার উপর ভরসা করতে বললেন। আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে বললেন। এমন সময় ছা’লাবা বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল আমার এমন মনে হচ্ছে যেন আমার হাড় আর মাংসের মাঝখানে পিঁপড়া হেঁটে বেড়াচ্ছে।’ রাসূল (সাঃ) বললেন, ‘ওটা হল মৃত্যুর ফেরেশতা। তোমার সময় এসেছে ছা’লাবা, শাহাদাহ পড়’। ছা’লাবা শাহাদাহ বলতে থাকলেন, ‘আল্লাহ ছাড়া ইবাদাতের যোগ্য আর কোন ইলাহ নেই, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসূল’ উনি শাহাদাহ বলতে থাকলেন... বলতেই থাকলেন... এমনভাবে তার রুহ শরীর থেকে বের হয়ে গেল।
মহানবী (সাঃ) ছা’লাবাকে গোসল করিয়ে জানাজার পর কবর দিতে নিয়ে যাচ্ছিলেন। আরো অনেক সাহাবা ছা’লাবাকে বহন করে নিয়ে যাচ্ছিলেন। মহানবী (সাঃ) পা টিপে টিপে অনেক সাবধানে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। উমর রাদিয়ালাহু আনহু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল, আপনি এভাবে কেন হাঁটছেন যেন ভিড়ের মাঝে হেঁটে চলেছেন.. কতো রাস্তা ফাঁকা পরে আছে, আপনি আরাম করে কেন চলছেন না ইয়া রাসুল?’
উত্তরে রাসূল (সাঃ) বললেন, ‘হে উমর, আমাকে অনেক সাবধানে চলতে হচ্ছে। সমস্ত রাস্তা ফেরেশতাদের দ্বারা ভরে গেছে। ছা’লাবার জন্য এতো ফেরেশতা এসেছে যে আমি ঠিকমত হাঁটার জায়গা পাচ্ছি না।'
Comments
Post a Comment